১. তােমরা ভােজন কি পান কিংবা যা কিছু কর না কেন , সবই যেন ঈশ্বরের গৌরবের জন্য হয় । ( ১ করি , ১০:৩১ ) । হে আমাদের প্রভু , আমাদের ঈশ্বর , গৌরব , প্রশস্তি ও পরাক্রম তােমারই , কেননা তুমিই সকল কিছুর স্রষ্টা , তােমার ইচ্ছায় সকলের সৃষ্টি ও স্থিতি ( প্রকাশিত বাক্য ৪:১১ ) ।
২. তুমি ছাড়া স্বর্গে আমার কে আছে ? এ পৃথিবীতে তােমা বিনা আর কিছুতেই আমার তৃপ্তি নেই । আমার দেহ , মন ক্ষীয়মান , ঈশ্বরই আমার হৃদয়ের বল , চিরকালের উত্তরাধিকার ( গীত , ৭৩ : ২৫ - ২৬)।
মানুষের অস্তিত্বের একটি কারণ আছে । এবং এই অস্তিত্বের কারণ মানুষের নিজের মধ্যে সন্ধান পাওয়া যায় না ! কারণ , ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন । ঈশ্বর মানুষকে তার নিজের প্রতিমূর্তিতে সৃষ্টি করেছেন । সৃষ্টির প্রাথমিক পর্বে মানুষ ঈশ্বরের প্রকৃত প্রতিমূর্তি ছিল । কারণ মানুষ আত্মকেন্দ্রিক নয় বরং ঈশ্বরকেন্দ্রিক ছিল । পাপ সবকিছু ধ্বংস করার পূর্বে , ঈশ্বরের সেবা এবং তার মধ্যে আনন্দ অনুভব করাই ছিল তার চিন্তা এবং বাসনা । মানুষ ( আদম ) যখন ঈশ্বরের বিরুদ্ধে প্রথম পাপ করল , সব কিছুর পরিবর্তন ঘটল । ঈশ্বরের মহানতা এবং সৌন্দর্যময়তা চিন্তা করার পরিবর্তে সে নিজের সম্পর্কে চিন্তা করা শুরু করল । সে চিন্তা করতে শুরু করল , সে ( আদম ) নিজেই যদি মহান হয়ে ওঠে , তা হলে কেমন হবে , এবং সে নিজেকে কীভাবে উপভােগ করতে পারে।
দুটি মানসিক বিন্যাস
আসুন আমরা এই দুটি পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য দেখতে চেষ্টা করি । চিত্ররূপ ১.১ উপস্থাপন করে যে , প্রথমে মানুষের ( আদম ) সৃষ্টি হয়েছে । এই চিত্ররূপটি দেখায় যে , জীবনের সমস্ত কর্মকাণ্ড ঈশ্বরের সেবায় এবং আনন্দোপলব্ধিতে সাধিত হত । চিত্ররূপ ১.২ উপস্থাপন করে পাপে পতিত মানুষকে । এখানে দেখান হয়েছে , জীবনের সমস্ত কর্মকাণ্ড নিজের সেবায় এবং আনন্দভােগে সম্পাদিত হয়েছে ।
অবশ্য , একথা সর্বাংশে সত্য যে , বহু মানুষই ঈশ্বরকে গৌরবান্বিত ও তাকে উপভােগ করার জন্য জীবন যাপন করে না । তারা ১.২ চিত্ররূপে প্রদত্ত বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত নয় । বিভিন্ন বিষয়ে তারা নিজেদের এমনভাবে নিয়ােজিত করেন , যে তাদের আত্মকেন্দ্রিক বলে চিন্তা করা কঠিন । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় , একজন মানুষ নিজেকে দেশের সেবায় উৎসর্গ করতে পারে , অথবা কোনও মানুষ মানবসমাজের কল্যাণ অনুসন্ধান করতে পারে । এমন বহু মানুষও রয়েছে যার “ সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের জন্য সর্বাধিক মঙ্গলের ধারণা নিয়ে জীবনযাপন করে । কিন্তু বাস্তবে এটিও জীবনের একই ধারণা যা আমরা দেখতে পাই চিত্ররূপ ১.২ - তে । এ একই হওয়ার কারণ , এ ঈশ্বরকেন্দ্রিক নয় , এ মানবকেন্দ্রিক । যে - ব্যক্তি মানুষের কল্যাণকে তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসাবে দেখেন , আসলে তিনি নিজেরই মঙ্গল খুঁজে বেড়াচ্ছেন , কারণ তিনি নিজেও একজন মানুষ ! তাই কেবল একজন প্রকৃত খ্রীস্টবিশ্বাসীই ( যে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে যীশুতে বিশ্বাসী ) ঈশ্বরের গৌরব এবং তাকে চিরদিনের জন্য উপভােগ করতে পারে । প্রশ্নোত্তরের প্রথম পর্বে দেখা যাবে আমরা কীভাবে ঈশ্বরকেন্দ্রিক মানুষ হতে পারি , যারা ঈশ্বরের গৌরব এবং তাকে চিরকালের জন্য উপভােগ করব ।
ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন
“ ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন ” করার অর্থ তাকে মহিমান্বিত করা নয় । বাস্তবিক ঈশ্বর মহিমান্বিত হয়েই আছেন । অনন্তকাল থেকেই তিনি মহিমান্বিত , ঈশ্বরসৃষ্ট কোনাে কিছুই তাকে তার অনন্ত মহিমার থেকে বেশি মহিমান্বিত করতে পারে না । তাই “ ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন ” করাকে আমাদের এইভাবে বুঝতে হবে : এর অর্থ , ঈশ্বরের মহিমা প্রতিফলিত করা । গীতসংহিতা ১৯ : ১ - এ আমরা দেখি , ‘ আকাশমণ্ডল ঈশ্বরের গৌরব বর্ণনা করে , বিতান তাহার হস্তকৃত কর্ম জ্ঞাপন করে । ” ঈশ্বরের সৃষ্ট সুন্দর জগৎ একটা দর্পণের মতাে । সেই “ দর্পণে দৃষ্টিপাত করলে আপনি ঈশ্বরের মহিমা দেখতে পাবেন । তা হলে , স্বর্গ ও মর্তের প্রধান লক্ষ্য হল , ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন বা প্রদর্শন করা কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে একটি পার্থক্য আছে : আমরা মহিমাকীর্তনের জন্য আমন্ত্রিত হয়েছি , কারণ আমরা মহিমাকীর্তন করতে চাই । আকাশমণ্ডল ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন করতে পারে না , কিন্তু বর্ণনা করতে পারে । আমরা ঈশ্বরের গৌরব করতে চাই আর সে কারণে আমাদের এই অপূর্ব সুযােগ দেওয়া হয়েছে । যীশু যখন পৃথিবীতে তাঁর পিতার সেবায় রত ছিলেন , তিনি এই কাজই করেছিলেন । “ তুমি আমাকে যে কার্য করিতে দিয়াছ , তাহা সমাপ্ত করিয়া আমি পৃথিবীতে তােমাকে মহিমান্বিত করিয়াছি ” ( যােহন ১৭ : ৪ ) । তিনি ঈশ্বরের ইচ্ছানুযায়ী কাজ করেছিলেন । তিনি এ কাজ করেছিলেন , কারণ তিনি তা করতে চেয়েছিলেন । এইভাবেই যীশু ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন করেছিলেন , এবং আমরা তাকে অনন্তকালের জন্য উপভােগ করব !
বহু মানুষ ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন বা তাকে চিরকালের জন্য উপভােগ করতে চায় না । ( প্রকৃতপক্ষে , যারা তাদের পাপের জন্য অনুতাপ ও খ্রীস্টের উপর তাদের বিশ্বাস স্থাপন করে , তারা ছাড়া আর কেউ পারে না ) । বহু মানুষ ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন করতে চায় না , তাই মনে হতে পারে যে , প্রশ্নোত্তর ’ সঠিক নয় , কারণ এখানে বলা হয়েছে , “ ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন করা মানুষের প্রধান লক্ষ্য । কিন্তু প্রশ্নোত্তর নির্ভুল । কোনাে মানুষ ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন এবং স্বেচ্ছায় তার সেবা করতে না - চাইলেও , তখনও সে ঈশ্বরের প্রজা । পৌল বলেছেন , “ একই মাটির তাল থেকে একটি সমাদরের পাত্র ও একটি অনাদরের পাত্র তৈরির অধিকার কি কুম্ভকারের নেই ? ঈশ্বর হয়তাে তার ক্রোধ আর ক্ষমতা প্রকাশ করতে চান বলেই ধ্বংসের জন্য নির্দিষ্ট ক্রোধের পাত্রদের ধৈর্য সহকারে সহ্য করছেন । কারণ তিনি চান , যারা তার করুণাভাজন এবং মহিমাপ্রাপ্তির যােগ্য , তারা যেন তাৱ মহিমার ঐশ্বর্য সম্বন্ধে পূর্ণভাবে অবহিত হতে পারে ” ( রােমীয় ৯ : ২১-২৩ ) । অন্যভাবে বলা যায় যে , হারিয়ে যাওয়া এবং উদ্ধারপ্রাপ্ত উভয়ের মধ্য দিয়ে ঈশ্বর প্রকাশিত হয়েছেন । একজনের মধ্য দিয়ে ( যারা উদ্ধারপ্রাপ্ত ) ঈশ্বরের করুণা প্রদর্শিত ও প্রশংশিত হতে পারে । অপরজনের মধ্য দিয়ে ( যারা হারিয়ে গেছে ) ঈশ্বরের ক্রোধ এবং বিচার প্রদর্শিত ও সম্মানিত হতে পারে । পার্থক্য হল , হারিয়ে যাওয়াদের ক্ষেত্রে ( যারা অনুতাপ এবং খ্রীস্টকে বিশ্বাস করে না ) , তারা এ উপভােগ না করলেও তিনি তাদের তার মহিমাকীর্তন করতে দেন । কিন্তু পরিত্রাণপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে , তারা ঈশ্বরের মহিমাকীর্তনের জন্য এগিয়ে আসে এবং তাকে চিরকালের জন্য উপভােগ করে ।
“ প্রধান লক্ষ্য ” - এর অর্থ কী
প্রশ্নোত্তর যখন মানুষের প্রধান লক্ষ্যর কথা বলে , আমরা অবশ্যই এমন কথা মনে করব না যে , প্রকৃত খ্রীস্টীয় জীবনকে কতকগুলি বিভাগে বা কক্ষে পৃথক করা যেতে পারে , যা একটা থেকে , আর একটা পৃথক । অবশ্য , এ কথা সত্য যে , খ্রীস্টবিশ্বাসীর জীবনে , আমরা যাকে “ ধর্ম ” বলি , তা ছাড়া অন্য ‘ লক্ষ্য ” ( উদ্দেশ্য ) থাকতে পারে । অন্যভাবে বলা যেতে পারে , শুধু “ আরাধনা , ” বা “ সাক্ষ্যদান , ” বা “ খ্রীস্টীয় সেবা ” ইত্যাদি খ্রীস্টীয় জীবনের সবকিছু নয় । আমরা এ কথাও যেন মনে না - করি যে , কোনাে ব্যক্তি সুসমাচার প্রচার করলে , সে আবশ্যিকভাবে ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন করে । বহু প্রচারক মিথ্যা মতবাদ প্রচার করেন , যার দ্বারা তারা ঈশ্বরের গৌরবকীর্তন করেন না । অথচ বহু খ্রীস্টবিশ্বাসী তাদের কর্মক্ষেত্রে বা ব্যবসাক্ষেত্রে এমনভাবে তাদের প্রতিদিনের কাজ করেন যে , তারা ঈশ্বরের মহিমাকীর্তনই করেন ! প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি হল , যখন কোন ব্যক্তি ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন করতে চায় , সে সর্বদা এবং সমস্ত কর্মে ঈশ্বরের সন্তোষজনক কাজ করে । সাব্বাথদিনে ঈশ্বরের আরাধনা করা , বা কোন অবিশ্বাসীর কাছে সাক্ষ্যদান করার মতােই বিশ্বস্ততাপূর্ণ কর্ম এবং স্বাস্থ্যকর আমােদ - প্রমােদ , ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন করার একটি অঙ্গ । নিঃসন্দেহে সত্য যে , আমাদের কতকগুলি কাজ অন্যগুলির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ । কিন্তু খ্রীস্টীয় শিষ্যত্বের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি হল , সচেতনভাবে ঈশ্বরের প্রতি সন্ত্রমপূর্ণভাবে , তার নামের গুণে জীবনযাপন করতে হবে ।
কথিত হয় যে , জীবনের সর্বস্ব হবে ঈশ্বরকেন্দ্রিক ( চিত্ররূপ ১.১ ) । আমরা আবার গুরুত্ব সহকারে বলতে চাই যে , খ্রীস্টে আত্মসমর্পণ করে পরিবর্তিত না - হলে কোনও মানুষই ঈশ্বরকেন্দ্রিক জীবনযাপন করতে পারে না । আমরা কীভাবে ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন করতে এবং তাকে চিরকালের জন্য উপভােগ করতে পারি , জানার জন্য পরিত্রাণ সম্পর্কিত বাইবেলের শিক্ষাকে জানতে হবে । আমাদের অবশ্যই শিখতে হবে , “ ঈশ্বর সম্পর্কে মানুষকে কী বিশ্বাস করতে হবে এবং ঈশ্বর মানুষের কাছে কী কৰ্তব্য প্রত্যাশা করেন । আর এ কারণে এই প্রশ্নোত্তরে , পরবর্তীকালে আমরা এ বিষয়ে মনােনিবেশ করব ।



0 Comments