আমাদের প্রথম পিতামাতা, তাঁদের নিজস্ব স্বাধীন ইচ্ছায় সমর্পিত হয়ে, ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ করে, তারা যে অবস্থায় সৃষ্ট হয়েছিলেন, সেখান থেকে পতিত হলেন।
পাপ হল, ঈশ্বরের বিধানের প্রতি যে-কোনাে রকম আনুগত্যের অভাব, বা অপরাধ।
নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের কারণে আমাদের প্রথম পিতামাতা যে-অবস্থায় সৃষ্ট হয়েছিলেন, সেই অবস্থা থেকে পতিত হলেন।
১. নারী দেখলেন, বৃক্ষটি সুন্দর, ফলগুলিও লােভনীয় এবং জ্ঞানলাভের জন্য বাঞ্ছনীয়ও বটে। তিনি তখন ওই গাছের ফল পেড়ে খেলেন এবং তাঁর স্বামীকেও দিলেন, আর তিনিও সেই ফল খেলেন (আদি , ৩:১৬)। দেখ, আমি শুধু এই একটি তত্ত্বই বুঝেছি, ঈশ্বর মানুষকে সৃজন করলেন সহজ ও সরল করে, কিন্তু মানুষ নিজেকেই জটিল করে তুলেছে (উপদেশক ৭:২৯)।
২. যে পাপ করে, সে বিধান লঙ্ঘন করে, এই বিধান লঙঘনই পাপ (যােহন ৩ : ৪)।
ঈশ্বর মানুষকে পাপশূন্য অবস্থায় সৃষ্টি করেছিলেন। সে ধার্মিকতায় এবং পবিত্রতায় ঈশ্বরের প্রকৃত প্রতিমূর্তি। কিন্তু সে তখনও সেই আশীর্বাদধন্য অবস্থা সম্পর্কে সুনিশ্চিত ছিল না। ঈশ্বর আমাদের প্রথম পিতামাতার সামনে দুটি বিকল্প পথ স্থাপন করেছিলেন। একদিকে, ছিল নিখুঁত আনুগত্যের পথ। এবং এই পথ চিরায়ত জীবনের পথে চালিত করতে পারে। পৌল বলেছেন, “... যে সমস্ত বিধিব্যবস্থা পালন করে, সে তার দ্বারাই জীবন পাবে” (গালাতীয় ৩:১২)। কিন্তু অন্যদিকে, অবাধ্যতার পথও ছিল। এবং এই পথ শুধু মৃত্যুর দিকে চালিত করতে পারে। সদাসদ্ জ্ঞানদায়ক বৃক্ষ সম্পর্কে ঈশ্বর আদমকে বলেছিলেন, “যেদিন সেই বৃক্ষের ফল তুমি খাবে, নিশ্চিত জেন, সেই দিনই হবে তােমার মৃত্যু" (আদি ২:১৭)। 'প্রশ্নোত্তর’ পাঠ করার সময় আমাদের চিন্তা করতে হবে যে, আমাদের প্রথম পিতামাতা “তাঁদের নিজস্ব স্বাধীন ইচ্ছায় সমর্পিত হয়েছিলেন,” এর অর্থ, আমাদের প্রথম পিতামাতার কাছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।
স্বাধীনতা এবং সামর্থ্য
(১) প্রথম, তাঁদের জীবন-অভিমুখী বশ্যতার পথ, অথবা মৃত্যু-অভিমুখী অবাধ্যতার পথ অনুসরণ করার স্বাধীনতা ছিল। আমরা বলছি, তাঁদের স্বাধীনতা ছিল, কারণ যে-কোন একটি পথে যাত্রা করার জন্য কেউ তাঁদের উপর বলপ্রয়ােগ করেনি। এমনকী শয়তানও তার ইচ্ছা মতাে কাজ করার জন্য তাঁদের উপর শক্তি প্রয়োগ করতে পারেনি। সে শুধু তাঁদের প্রলােভিত করতে পারে। সে শুধু তার ইচ্ছামতো তাঁদের আকাঙ্খার মধ্য দিয়ে কাজ করানাের জন্য তাঁদের প্ররােচিত করতে পেরেছিল।
(২) দ্বিতীয়ত, দুটি বিকল্পের মধ্যে যে-কোন একটিকে বেছে নেবার সামর্থ্য তাঁদের ছিল। অন্য ভাষায় বলা যায়, ভালাে বা মন্দ যে-কোন একটিকে বেছে নেবার শক্তি তাঁদের মধ্যে ছিল (কারণ ঈশ্বর তাঁর শক্তি দিয়ে তাঁদের সৃষ্টি করেছেন)। প্রশ্নোত্তরের অন্যান্য অধ্যয়নে আমরা লক্ষ করব, এ সেই ভালাে বা মন্দ কাজ করার ক্ষমতা বা সামর্থ্য যা পতনের ফলে সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছিল। প্রথম পাপের পর, আদম এবং তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের ভালাে বা মন্দ কাজ করার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু তাদের ভালাে কিছু করার ক্ষমতা নেই। এই ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই বলব যে, তাদের প্রাথমিকভাবে যা ছিল সেই “তাদের নিজস্ব ইচ্ছার স্বাধীনতা” তা তারা হারিয়ে ফেলেছিল। আমরা যদি বলি, “মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা" আছে, তা হলে আমরা ঠিকই বলব, যদি আমরা এই অর্থ করি যে, কোন কিছু বা কারও দ্বারা সে মন্দ কাজ করতে বাধ্য হয়নি। কিন্তু যদি আমরা বলি, সেই মানুষটি, তার পতিত অবস্থাতেও ভালাে কাজ করতে সমর্থ, তা হলে ঠিক বলব না। “সৎকর্ম করে এমন একজনও নেই” (রােমীয় ৩:১২)।
'প্রশ্নোত্তর’ সুস্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, আদম এবং হবার “কাহিনী" সত্য। আজকের দিনে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, কারণ বহু ভণ্ড শিক্ষক বাইবেলের বক্তব্যকে অস্বীকার করেন। কিন্তু বাইবেল যা শিক্ষা দেয়, তাকে তাঁরা যে-পদ্ধতিতে অস্বীকার করেন, সেটাই আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বাইবেলের শিক্ষাকে অস্বীকার করে, এমন লােকের অভাব কোনদিনই ছিল না। বিশেষভাবে আমরা এদন উদ্যানের মানুষের পতনের কাহিনী উল্লেখ করব। কিন্তু বর্তমান কালের অস্বীকারের বিপজ্জনক দিকটি হল, সেগুলি প্রত্যক্ষ এবং সরল নয়। উদাহরণস্বরূপ, এই ধরনের কোনাে শিক্ষক বলতে পারেন, “আমি বিশ্বাস করি যে, আদম এবং হবার কাহিনীর মধ্যে সত্যতা আছে। আমি স্বীকার করছি। আমি অন্যদেরও তা শিক্ষা দিই।” কিন্তু তিনি কী বলতে চান? তিনি কি বলতে চান যে, আদম নামে এক ব্যক্তি ছিলেন যিনি এক বিশেষ কালে এবং স্থানে বসবাস করতেন, যিনি ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ আদেশের বিরুদ্ধতা করে একটি গাছ থেকে ফল নিয়েছিলেন? না, তিনি বলতে চান যে, ঈশপের গল্পগুলি যেমন “সত্য”, আদম-হবার “কাহিনীও" একই রকম সত্য। এই আধুনিকতাবাদীদের ভাষায় সত্যের অর্থ, ঘটনাটি প্রকৃতই ঘটেছিল, তা নয়। এর একমাত্র অর্থ যে, তারা “এই কাহিনীর মধ্যে" কয়েক ধরনের "শিক্ষা” খুঁজে পান। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, আধুনিকতাবাদীদের কাছে আদমের নিষিদ্ধ ফল ভােজন পুরাকাহিনী বা লােককথা ব্যতীত আর কিছুই নয়; সকল মানুষের অভিজ্ঞতায় যা ঘটেছিল, তা-ই (রূপক-কাহিনীর আকারে) অভিব্যক্ত হয়েছে। তাঁদের কাছে এটা কোন ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। বরং, এ একটি "কাহিনী-চিত্র” যা সকল সময়ে সকল মানুষের অভিজ্ঞতা ঘটে চলেছে। অন্তত অধিকাংশ ক্ষেত্রে, এই ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির কারণ বিবর্তনবাদ এবং অন্যান্য মানবিক পদ্ধতির শিক্ষা, যা ঈশ্বরকে বাদ দিয়েই বিষয়গুলির অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে চেয়েছে। কিন্তু আমরা আদম-হবা ও পতনের কাহিনীকে সত্য বলেই বিশ্বাস করি (যা সত্য সত্যই ঘটেছিল)। এই বিবরণীকে যীশু (মথি ১৯ : ৪ দেখুন) এবং প্রেরিতশিষ্য পৌল (রােমীয় ৫ : ১২-২১) সত্য বলেই গ্রহণ করেছিলেন।
শুধু ঈশ্বরই সঠিক এবং ভুলের সংজ্ঞার্থ নির্ধারণ করেন
প্রথম পাপের বিবরণটি আবার পাঠ করলে (আদি ২:১৭; ৩ : ১-৮) আমরা সুস্পষ্টভাবে একটি বিষয় দেখতে পাব। শুধু ঈশ্বরেরই “এটা ঠিক”, “এটা ভুল” বলার অধিকার আছে। এবং ঈশ্বরের বাক্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকলে, আদম কোনটি ঠিক নিশ্চয় জানতে পারতেন (আদি. ২ : ১৭)। একটি মাত্র নিয়মই আদমকে ভুল বা সঠিক নির্ধারণ করতে সাহায্য করতে পারত, তা হল ঈশ্বরের আজ্ঞা। এই কারণে শয়তান এই বিষয়ের উপরই তার ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করেছিল। সে বলেছিল, “তুমি অবশ্যই মরবে না” (আদি. ৩ : ৪)। অন্যভাবে বলা যায়, সে আদমকে এই চিন্তা গ্রহণ করার জন্য প্রলােভিত করল যে, ঈশ্বরের বাক্যকে একমাত্র নিশ্চিত নিয়মরূপে গ্রহণ করার প্রয়ােজন নেই। সে আদমকে চিন্তা করতে প্রলােভিত করল যে, কোনটি সর্বোত্তম, সে নিজেই তা নির্ধারণ করতে পারে। বৈপরীত্যের জন্য একে ব্যক্ত করতে গিয়ে আমরা বলতে পারি:
(১) পাপ সম্পর্কে ঈশ্বরের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, “পাপ হল, ঈশ্বরের বিধানের প্রতি যে-কোন রকম আনুগত্যের অভাব, যা অপরাধ।”
(২) আদমের প্রতি শয়তানের পরামর্শ ছিল যে, “মানুষের কাছে যা ক্ষতিকর হিসাবে প্রমাণিত হয়", তা-ই পাপের সংজ্ঞার্থ। এখনও পর্যন্ত এই দুটিই পাপের একমাত্র সংজ্ঞার্থ। পাপ হয় “যা ভুল, কারণ ঈশ্বর এই রকম বলেন", অথবা “যা ভুল, কারণ এ আমাদের ক্ষতি করে।'' এবং পাপের ভ্রান্ত সংজ্ঞার্থের দ্বারা আমরা কোনদিনই আবিষ্কার করতে পারি না, আমাদের পাপ কত গুরুতর। অধিকন্তু, আমরা মানুষের মধ্যে বিশ্বজনীন অঙ্গীকার দেখি না। একজনের কাছে যা ক্ষতিকর বলে মনে হয়, অন্যজনের কাছে তা নয়। একটি বিষয় যা একজনের পক্ষে পাপ বলে বিবেচিত হয়, অন্যজনের কাছে তা নয়।
কিন্তু পাপ সম্পর্কে ঈশ্বরের সংজ্ঞার্থ থেকে আমাদের অবস্থানকে আমরা সঠিকভাবে জানতে পারি। সকল মানুষের জন্য নিয়ম একই। চিত্ররূপ দুটিতে আপনি দুটি বিশেষ পাপ সম্পর্কে জানতে পারছেন। এক দিকে (১১.১ চিত্ররূপ), “বিধানের প্রতি আনুগত্যের অভাব”| আমাদের যখন কোন কর্তব্য সম্পাদন করার থাকে, অথচ করি না, ঈশ্বরের বিধানের প্রতি আমাদের আনুগত্যের অভাব ঘটে। ঈশ্বর আমাদের দিয়ে যে-কাজ করাতে চান, তা না-করার জন্য আমরা অপরাধী। পাপ সম্পর্কে চিন্তা করার সময় বহু মানুষ এ কথা আদৌ চিন্তা করে না। তারা অন্য ধরনের পাপের কথা চিন্তা করে (যাকে বলা হয়,)। কারণ তারা দিব্য করে না, চুরি করে না, বা হত্যা করে না, তারা মনে করে যে, তারা বড় ধরনের পাপী নয়। তবুও, তারা বড়াে ধরনের পাপী হতে পারে, কারণ তারা ঈশ্বরের আরাধনা করে না এবং বিশ্রামবারকে পবিত্ররূপে পালন করে না, ইত্যাদি।
অন্যদিকে (চিত্ররূপ ১১.২), আমরা দেখি যে, পাপ “ঈশ্বরের বিধানের প্রতি অপরাধও হতে পারে," এর অর্থ, আমরা যখন ঈশ্বরের অনভিপ্রেত কোন কাজ করি, তখন আমরা অপরাধী হই। নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের কারণে আদমের পাপ, অপরাধের একটি দৃষ্টান্ত।
আমরা যদি পাপের এই সংজ্ঞার্থকে মনে রাখি, আমরা উপলব্ধি করতে পারব যে, আমাদের প্রথম পিতামাতার পাপ প্রকৃতই এক ভয়ঙ্কর পাপ ছিল। লােকেরা কখনও কখনও বলে থাকে, এত ছােট্ট একটা পাপের (যেমন কোন বালক প্রতিবেশীর গাছ থেকে আপেল পেড়ে নেয়) কী করে এত ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে (উদ্যান থেকে বিতাড়িত, মৃত্যু, এমনকী নরকভােগ)! যখন আমরা দেখি যে, পাপ “ঈশ্বরের বিধানের প্রতি যে-কোন রকম আনুগত্যের অভাব বা অপরাধ”। অন্যভাবে বলা যায়, যখন আমরা দেখি, মহান, উত্তম এবং পবিত্র ঈশ্বরের বিরুদ্ধাচরণ বলেই পাপ এত ভয়াবহ – আমরা দেখি যে, এই আপত্তিও মূল্যহীন। যে-লােকেরা পাপ সম্পর্কে এইভাবে কথা বলে, তারা দেখায় যে, তারা সঠিকভাবে পাপের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে না। কারণ, ঈশ্বর কত মহান, তা যদি আমাদের দেখতে হয়, ঈশ্বর এবং তাঁর বিধানের প্রেক্ষিতে পাপের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। যখন আমরা পাপ করা বন্ধ করি ও চিন্তা করি যে,
(১) আদম এক পবিত্র ঈশ্বরের আজ্ঞার বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন, (২) যখন তাঁর সঠিক কাজ করার স্বাধীনতা ও সামর্থ্য ছিল, সেই সময়েই তিনি বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন এবং (৩) অবাধ্যতার ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে তাঁকে আগেই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল, তখন আমরা বুঝি, এ সত্যিই কত ভয়ঙ্কর ছিল।





0 Comments