ঈশ্বরের রাজ্য
The Kingdom of God
ঈশ্বরের রাজ্য যীশুর প্রচারের মূল কেন্দ্রীয় বিন্দু বা মূল বিষয়। যীশুর শিষ্য বা প্রেরিতদের বিষয়বস্তু স্বর্গরাজ্য। পুরাতন নিয়মের বিশ্বাসীর যে সকল প্রত্যাশা ছিল, তাদের মধ্যে ঈশ্বরের রাজ্যের আগমণ ছিল অন্যতম বিষয়। দানিয়েল পুস্তকে এই প্রত্যাশার সঙ্গে “মনুষ্য পুত্রের আগমণকে” বা আবির্ভাবকে সংযুক্ত করা হয়েছে। পুরাতন নিয়মের এই প্রত্যাশা খ্রীষ্টেতে সাধিত হয়েছে বা পূর্ণতা লাভ করেছে। এই কারণে ঈশ্বরের রাজ্য সম্বন্ধে যীশুর সকল কার্য্য বা বাক্য সমূহকে পরিশেষ তত্ত্বের বিষয়বস্তু বিসাবে ধরা সম্ভব। নূতন নিয়মেও এই আগমণকে পুরাতন নিয়মের প্রতিজ্ঞার পূর্ণতা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
১। ঈশ্বরের রাজ্যের ষোষণাকারী বা যোহন বাপ্তাইজক
(মথি ৩:২, ১১-১২) নূতন নিয়মের শুরুতে
আমরা শুনতে পাই যে, যোহন বাপ্তাইজক তার শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন – “ঈশ্বরের
রাজ্যের আগমণের জন্য প্রস্তুত হতে” এবং তিনি
তার ঘোষণায় উল্লেখ করেছেন যে, এই ঈশ্বরের রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ঘটবে তার পশ্চাৎ আসছেন
এমন একজন ব্যক্তির দ্বারা (মথি ৩:২, ১১)। এই আগত ব্যক্তির আগমণ সম্বন্ধে যোহন বাপ্তাইজকের
ধারণা ছিল যে, তিনি একদিকে যেমন অনুতপ্তদের পরিত্রাণ করবেন, ঠিক অপর দিকে যারা অনুতাপ
করবে না তাদের বিচার করবেন (মথি ৩:১২)। মোশীহের কার্য্য সম্বন্ধে যোহন বাপ্তাইজকের
ধারণা ছিল যে, মোশীহের এই দুই কার্য্য (পরিত্রাণ ও বিচার) একই সময়ে সাধিত হবে বা খ্রীষ্ট
তাঁর প্রথম আগমণের দ্বারা উভয় কার্য্যই সাধন করবেন। কিন্তু পরবর্তী ক্ষেত্রে যোহন
বাপ্তাইজক যখন কারাগারে ছিলেন এবং খ্রীষ্টের কর্মের বিষয়ে তিনি যা শ্রবণ করেছিলেন
তাতে তাঁর উপরিউক্ত ধারণা অনুসারে প্রকৃত খ্রীষ্ট সম্বন্ধে তাঁর মনে প্রশ্ন হয়েছিল,
তাই তিনি তাঁর শিষ্যদের মারফৎ প্রশ্ন করেছিলেন যে - যীশুই কি সেই মোশীহ? না কি অন্যের
অপেক্ষায় থাকতে হবে? কারণ তিনি যীশুকে গম সংগ্রহ করতে দেখলেও তুষকে আগুনে পোড়াতে দেখেননি
(মথি ১১:২-৩)।
এর উত্তরে
যীশু তাঁর নিজের সম্বন্ধে পুরাতন নিয়মের বিভিন্ন ভবিষ্যৎ বাণীর পূর্ণতার কথা উল্লেখ
করেছিলেন (মথি ১১:৪-৫)। এই উওরের দ্বারা যীশু যোহনকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, মোশীহ হিসাবে
তাঁর আগমণের অন্যতম কার্য্য পরিত্রাণ শুরু হলেও অপর কার্য্য বিচার পরবর্তী সময়ে আসতে
চলেছে - অর্থাৎ বিচার কার্য্য তাঁর প্রথম আগমণের দ্বারা নয়, কিন্তু দ্বিতীয় আগমণের
দ্বারা সাধিত হবে। এই ভাবে মেশীহের কার্য্য সম্বন্ধে যোহন বাপ্তাইজকের ধারণার সংশোধন
ঘটেছিল।
২। ঈশ্বরের রাজ্যের স্থাপনকারী যীশু
যীশুও তাঁর
কার্য্য যোহনের ন্যায় ঘোষণার দ্বারা শুরু করেছিলেন (মার্ক ১:১৫)। দুইজনের ঘোষণা প্রায়
সমান হলেও তার মধ্যেও পাকা আছে। এই পার্থক্যের চাবিকাঠি যীশুর ঘোষণার মধ্যে - “কাল সম্পূর্ণ হইল” এই কথার মধ্যে আছে। যেখানে
যোহন বলেছিলেন স্বর্গরাজ্য সন্নিকট হইল, সেখানে যীশু বলেছিলেন “ভাববাদীদের দ্বারা কথিত শাস্ত্রের বচন আমাতে
পূর্ণ হইল" (লুক ৪:২১)। অর্থাৎ যীশুর ব্যক্তিত্ব এবং
কার্য্যের দ্বারা স্বর্গরাজ্যের আনয়ণ ঘটেছিল। এই কারণে যোহন বাপ্তাইজক যে কথা কখনো
বলতে পারেনি, যীশু তা বলতে পেরেছিলেন - “ঈশ্বরের
রাজ্য তোমাদের মধ্যে আসিয়া পড়েছে” (মথি ১২:২৪,
১১:২০)।
এই কারণেই
যীশু যোহন বাপ্তাইজক সম্বন্ধে এমন কথা বলেছিলেন যে – “মায়ের গর্ভজাত সকলের মধ্যে যোহনই শ্রেষ্ঠ, কিন্তু
স্বর্গরাজ্যের ক্ষুদ্রতম ব্যক্তি তাঁর থেকেও মহান” (মথি ১১:১১)। যোহন বাপ্তাইজক
ঈশ্বরের রাজ্যের অগ্রদূত হলেও নিজে এই রাজ্যের বাইরে ছিল বা তিনি নূতন ঘোষণা করলেও
নিজে তার অংশ ছিলেন না। কারণ যোহনের দ্বারা ঘোষিত ঈশ্বরের রাজ্য - যীশুর বাক্য ও কার্য্যে,
অলৌকিক কার্য্য ও দৃষ্টান্তে, শিক্ষা ও প্রচারে উপস্থিত ছিল এবং মনুষ্যদের মধ্যে কার্য্যকারী
ছিল।
সুসমাচারের
অনেক স্থানে খ্রীষ্টের নামকে ঈশ্বরের রাজ্যের সাথে সমান করে দেখানো হয়েছে। পিতরের
প্রশ্ন - “দেখুন আমরা সমস্তই পরিত্যাগ করিয়াই আপনার পশ্চাৎগামী
হইয়াছি, তবে আমরা কি পাইব”? এর উত্তরে
মথিতে যীশু বলেছেন, "আমার নামের জন্য
(মথি ১৯:২৯), মার্ক সুসমাচারে “আমরা ও
সুসমাচারের নিমিত্ত (১০:২৯), লুক সুসমাচারে “ঈশ্বরের
রাজ্যের নিমিত্ত” (লুক ১৮:২৯) ইত্যাদি
বিষয় যীশু উল্লেখ করেছিলেন - অর্থাৎ খ্রীষ্টের নামকে ঈশ্বরের রাজ্যের সমার্থক শব্দ
হিসাবে সুসমাচারে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রেরিতদের-কার্যবিবরণীতেও খ্রীষ্ট এবং ঈশ্বরের
রাজ্যকে একই অর্থে বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার করা হয়েছে (প্রেরিত ৮:১২, ২৮:৩১) ।
এই কারণেই
ঈশ্বরের রাজ্য শব্দটি নুতন নিয়মেতে সুসমাচারের তুলনায় পত্রাদিতে কম সংখ্যায় ব্যবহৃত
হয়েছে। পৌলের পত্রগুলিতে “রাজ্য" শব্দটি
মাত্র ১৩ বার এবং অন্যান্যদের লেখা পত্রগুলিতে মাত্র ৫ বার ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ
এই নয় যে প্রেরিতেরা ঈশ্বরের রাজ্যের বিষয় শিক্ষা বা প্রচার করেনি। কিন্তু "প্রভু
যীশু খ্রীষ্ট" এই কথার দ্বারা তারা ঈশ্বরের রাজ্যের প্রতি নির্দেশ করেছে।
৩। ঈশ্বরের রাজা ও স্বর্গরাজ্য (Kingdom of God & Kingdom of Heaven)
কেবল মাত্র
মথি সুসমাচারে স্বর্গরাজ্য কথাটির প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায়। কেননা ঈশ্বরের রাজ্য এবং
স্বর্গরাজ্যের মধ্যে অর্থগত কোন পার্থক্য নেই। যেহেতু ইহুদীরা ঈশ্বরের পবিত্র নাম উচ্চারণ
করা থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখতো বা ঈশ্বরের নাম উচ্চারণের ক্ষেত্রকে এড়িয়ে যেত। পরবর্তী
ক্ষেত্রে স্বর্গ শব্দটি ঈশ্বর শব্দের বিকল্প হিসাবে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়। মথি যেহেতু
মুলতঃ ইহুদী পাঠকদের উদ্দেশে সুসমাচার লিখেছিলেন, সেইহেতু ঈশ্বরের পবিত্র নাম ব্যবহারের
পরিবর্তে তিনি স্বর্গ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। অতএব ঈশ্বরের রাজ্য এবং স্বর্গরাজ্য
শব্দগুলি একই অর্থ প্রকাশ করে।
৪। ঈশ্বরের রাজ্যের বর্ণনা (The Description of Kingdom of God)
ঈশ্বরের
রাজ্য কি? ঈশ্বরের রাজ্য বর্ণনা করা সহজ কাজ নয়, বিশেষতঃ যীশু নিজে ঈশ্বরের রাজ্যের
বিষয় কোন প্রত্যক্ষ্য সংজ্ঞা দেননি। প্রেরিতদের লেখনীতেও এই বিষয়ে পরিষ্কার সংজ্ঞা
পাওয়া যায় না। রোমীয় ১৪:১৭ পদে পৌল যদিও আমাদের এই বিষয়ে সাহায্য করেছেন, তবুও একে
পৃথক অর্থের সংজ্ঞা হিসাবে ধরা অসম্ভব।
ঈশ্বরের
রাজ্যের কেন্দ্রীয় অর্থ অন্বেষণের পথে সর্বপ্রথমে আমাদের দেখতে হবে যে, এ কি কোন Realm বা Territory (কোন স্থান)
কে উল্লেখ করে? না কি ঈশ্বরের Reign বা Rule (ঈশ্বরের রাজত্ব) কে উল্লেখ
করে? সর্বাধিক প্রচলিত এবং সাধারণ চিন্তাধারা অনুসারে এ ঈশ্বরের Reign বা Rule এ Territory নয়। ঈশ্বরের
রাজত্বের ফলস্বরূপ আমরা বিভিন্ন বিষয়ে সুন্দর সমন্বয়, শান্তির পরিবেশ, বা সুখের পরিবেশ
ভোগ করতে পারি। এই কারণে ঈশ্বরের রাজ্য ভোজন পান নয়, কিন্তু ধার্মিকতা, শান্তি, এবং
পবিত্র আত্মার আনন্দ (রোমীয় ১৪:১৭)।
সহজ কথায়
যীশু খ্রীষ্টের মাধ্যমে মানব-জাতির ইতিহাসে ঈশ্বরের রাজত্বকে-ঈশ্বরের রাজ্য বলা হয়।
এই ঈশ্বরের রাজ্যের উদ্দেশে ঈশ্বরের লোকদের পাপ ও শয়তানের কর্তৃত্ব থেকে উদ্ধার করে
এবং নূতন আকাশ মণ্ডল ও পৃথিবীর চূড়ান্ত স্থাপন করা। এই পরিস্থিতিতে যীশু খ্রীষ্টেতে
পরিত্রাণের ইতিহাসের কাহিনী শুরু হয়ে গেছে এবং আমরা নুতন যুগে প্রবেশ করেছি। এই ঈশ্বরের
রাজ্য শুধুমাত্র কিছু মানুষের পরিত্রাণ সাধন অর্থে বা ঈশ্বরের লোকদের হৃদয়ে ঈশ্বরের
রাজত্বের অর্থেও চিন্তা করলে চলবে না। এর অর্থ - সমগ্র সৃষ্টি বিশ্ব ভূমণ্ডলের উপর
ঈশ্বরের রাজত্ব স্থাপন। অতএব ঈশ্বরের রাজ্যের অর্থ – ঈশ্বর
হলেন রাজা এবং ইতিহাসকে স্বর্গীয় লক্ষ্যের প্রতি নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি কাজ করে চলেছেন।
অতএব এ মানুষের দ্বারা অর্জন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এ ঈশ্বরের সার্বভৌম অনুগ্রহের দ্বারা
স্থাপিত এবং রাজ্যের আশীর্বাদ সমূহ সেই অনুগ্রহের উপহার স্বরূপ আমরা গ্রহণ করতে পারি।
অতএব এই রাজের অস্তিত্ব আনয়ণ করা মনুষের দায়িত্ব নয়, কিন্তু সে বিশ্বাস দ্বারা এর
মধ্যে প্রবেশ করতে পারে বা তাদের বিশ্বাস দ্বারা এর মধ্যে প্রবেশ করা এবং ঈশ্বরের রাজত্বের
নীচে তাদের জীবনের প্রতিটি বিষয় আরো বেশি করে সমর্পিত হওয়ার জন্য প্রার্থনা করা,
অর্থাৎ এ মানুষের নিখুঁত হওয়ার উদ্দেশে ঊর্দ্ধমুখী উত্থান নয়, কিন্তু মানুষের ইতিহাসে
ঈশ্বরের প্রবেশ এবং তাঁর রাজত্ব স্থাপন ও তার উদ্দেশে স্থাপন।
এই ঈশ্বরের
রাজ্যে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় দিকই আছে। একদিকে যারা এ গ্রহণ করবে এবং বিশ্বাসের
দ্বারা এতে প্রবেশ করবে, তাদের জন্য আছে পরিত্রাণ। কিন্তু অপরদিকে যারা একে বর্জন করবে,
তাদের জন্য আছে বিচার। উদাহরণ - মথি ৭:২৪-২৭ (পাষাণের উপর গৃহ এবং বালুকার উপর গৃহ),
মথি ২২:১-১৪ (বিবাহ ভোজের দৃষ্টান্ত), মথি ২১:৪৩ (ইস্রায়েলের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে
অন্য জাতিকে দেওয়া হবে)। এই রাজ্যের প্রাথমিক উদ্দেশ্য সর্বাত্মক অর্থে যারা গ্রহণ
করবে, তাদের পরিত্রাণ (যোহন ৩:১৭, লুক ২০:১৮), কিন্তু যার বর্জন করবে, তাদের জন্য বিচার
হবে (লুক ২০:১৮)।
৫। ঈশ্বরের রাজ্যের উপস্থিতির বিভিন্ন চিহ্ন সমূহ –
ক) যীশুর দ্বারা দিয়াবলকে দূরীভূতকরণ
–
যখন যীশু ভূত ছাড়িয়ে ছিলেন বা শয়তানকে দূর করেছিলেন
তখন তার দ্বারা তিনি দেখিয়েছিলেন যে, তিনি মন্দ শক্তির উপর জয়লাভ করেছেন এবং ফলস্বরূপ
ঈশ্বরের রাজ্য এসে পড়েছে। যীশু নিজে এই বিষয়ে ফরিশীদের উত্তর দিয়েছেন, যখন তারা
যীশুকে ভূত ছাড়াতে দেখে বেলসবূলের শক্তির দ্বারা ভূত ছাড়ানোর শক্তির কথা উল্লেখ করেছে।
খ) শয়তানের পতন –
যখন ৭০
জন শিষ্য তাদের প্রচার কার্য্য শেষ করে ফিরে এসে বলেছিল যে, খ্রীষ্টের নামের দ্বারা
ভূতেরাও পালায়। তখন যীশু তাদের উদ্দেশে বলেছিলেন — শয়তানকে
স্বর্গ থেকে বিদ্যুতের ন্যায় পতিত হতে (লুক ১০:১৮)। এর অর্থ ইহুদীদের চিন্তানুসারে
যে বিজয় যুগান্তে ঘটবার কথা তা যীশুর কার্য্যের দ্বারা শুরু হয়ে গিয়েছিল। যদিও শয়তানের
উপর এই বিজয় লাভ করেছেন, তবুও শয়তানকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করা হয়নি। কারণ যীশুর
পরবর্তী জীবন কার্য্যে এই শয়তান তাঁকে বারংবার ব্যাতিব্যস্ত করেছিল (মার্ক ৮:৩৩, লুক
২২: ৩,৩১)। অর্থাৎ যীশুর প্রথম আগমণের কার্য্যের দ্বারা শয়তানকে বাঁধা হয়েছিল (মথি
১২:২৯, প্রকা: ২০:২), যার ফল-স্বরূপ বিশ্বাসীদের জীবনে শয়তানের কার্য্য সীমিত হয়েছে।
গ) অলৌকিক কার্য্য সাধন –
যীশু এবং তাঁর শিষ্যদের দ্বারা প্রকৃতির নিয়মের
বিরুদ্ধে অনেক অলৌকিক কার্য্য সাধিত হয়েছিল। এই সকল অলৌকিক কার্য্য সাধনের দ্বারা ঈশ্বরের
রাজ্যের আগমণ ও উপস্থিতি অনুভূত হয়েছিল। যোহন বাপ্তাইজকের প্রশ্নের উত্তরে যীশু নিজে
এই বিষয় উল্লেখ করেছিলেন (মথি ১১: ৪-৫)। তবুও এই সকল অলৌকিক কার্য্য-সমূহ চিহ্নমাত্র
ছিল এবং তাদের সীমা ছিল। কারণ সেই সময় যত রোগী ছিল, তারা সকলে সুস্থ হয়নি। আবার যে
অন্ধ চক্ষু পেয়েছিল বা মৃত জীবন পেয়েছিল, তাদের আবার একদিন মরতে হয়েছিল - অর্থাৎ
যীশু ও শিষ্যদের দ্বারা সাধিত ঐ সকল অলৌকিক কার্য্য-সমূহ ঈশ্বরের রাজ্যের আগমণ ও উপস্থিতির
বিষয় সাক্ষ্য দিলেও (চিহ্ন-স্বরূপ হলেও) ঈশ্বরের রাজ্যের চুড়ান্ত সম্পূর্ণতা এখনো
আসেনি।
ঘ) সুসমাচার প্রচার –
শারীরিক আরোগ্যদানের থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ আশীর্বাদ
যীশু সুসমাচার প্রচারের দ্বারা আনয়ণ করেছিলেন। কারণ সেই সুসমাচারে বিশ্বাসের দ্বারা
মানুষেরা সার্বিক পরিত্রাণ লাভে সক্ষম হয়েছে। এই কারণে লুক ১০:২০ পদে যীশু শিষ্যদের
সুসমাচার প্রচারের গুরুত্বকে মন্দ আত্মার শক্তির উপর জয়লাভের থেকেও বেশি প্রাধান্য
দিয়েছেন। একই ভাবে যোহন বাপ্তাইজকের প্রশ্নের উত্তরেও ঈশ্বরের রাজ্যের আগমণ ও উপস্থিতি
সম্বন্ধে যীশুর দরিদ্রদের নিকট সুসমাচার প্রচারকে চিহ্ন হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে
(মথি ১১:৫)।
ঙ) পাপ ক্ষমা দান –
পুরাতন
নিয়মের বিভিন্ন ভাববাদী পুস্তকে পাপ ক্ষমাদানের বিষয়টিকে আগত মোশীহের যুগে একটি আশীর্বাদ
হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে (যিশাইয় ৩৩:২৪, যিরমিয় ৩১:৩৪, মীখা ৭:১৮-২০, সখরিয় ১৩:১)।
যীশু কেবলমাত্র পাপ ক্ষমা প্রচার করেছিলেন এমন নয়, কিন্তু প্রকৃত ভাবে পাপের ক্ষমাদান
করেছিলেন (মার্ক ২:১০)। যীশু যখন সেই পক্ষাঘাতীর পাপ ক্ষমা করেছিলেন তখন অধ্যাপকেরা
তার বিরুদ্ধে বচসা করেছিলেন, কারণ তারা বুঝতে পারেনি যে, ঈশ্বরের রাজ্যের উপস্থিতির
বিষয় শিক্ষা নূতন কোন বিষয় নয়, কিন্তু যীশুর দ্বারা ভাববাদীদের উক্ত বিষয়ের পূর্ণতা।
কিন্তু
এ স্মরণে রাখতে হবে বা স্মরণে রাখা ভালো যে, ঈশ্বরের রাজ্যের আগমণ সত্ত্বেও উত্তম এবং
মন্দের মধ্যে দ্বন্দ্ব এখনো শেষ হয়নি। ঈশ্বরের রাজ্য ও মন্দ রাজ্যের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব
ইতিহাসে চলতে থাকবে এবং অনেক ক্ষেত্র বিশ্বাসীরা দুঃখ ভোগের জন্য আহত হবে। এই কারণে
মথি ১০-৩৪ পদে যীশু বলেছিলেন যে তিনি শান্তি আনয়ণ করতে নয়, কিন্তু খড়্গ আনয়ণ করতে
এসেছেন।
৬) ঈশ্বরের রাজ্যে বর্তমান ও ভবিষ্যত দিক –
ঈশ্বরের
রাজ্য সম্বন্ধে পবিত্র শাস্ত্রের শিক্ষানুসারে বর্তমান ও ভবিষ্যত উভয় বিষয়েরই উল্লেখ
পাওয়া যায়। যীশু প্রথম আগমণের দ্বারা একদিকে যখন ঈশ্বরের রাজ্যের আগমণ ও উপস্থিতির
ফল-স্বরূপ বর্তমান দিকটি প্রকাশিত হয়েছে, অপর দিকে এখনো পূর্ণতা পায়নি এমন বিষয়েরও
উল্লেখ পাওয়া যায়।
ক) যীশুর শিক্ষায় ঈশ্বরের রাজ্যে বর্তমান ও ভবিষ্যত দিক –
অ) বর্তমান দিক
যীশু খুব
পরিষ্কার ভাবে শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, তাঁর ব্যক্তিত্ব ও কার্য্যের দ্বারা ইতিপূর্বে
ঈশ্বরের রাজ্যের আগমণ ঘটে গেছে। ফলস্বরূপ তাঁর ব্যক্তিত্ব ও কার্য্যে ঈশ্বরের রাজ্য
উপস্থিত ছিল (মথি ১২:২৮, ১১:২০)। ঈশ্বরের রাজ্য এসে গেছে- একে গ্রীকে বলে Pthasen বা ইংরাজীতে বললে বলা যায়
has arrived বা has come। লুক ১৭:২০ পদে ফরিশীরা যীশুকে ঈশ্বরের রাজ্যের সম্বন্ধে প্রশ্ন
করেছিল । কারণ ঈশ্বরের রাজ্যের সম্বন্ধে ফরিশীদের ধারণা ছিল রোমীয়দের ধ্বংস করে সমগ্র
পৃথিবীর উপর ঈশ্বর নূতন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে এবং যা তারা স্বচক্ষে নিরীক্ষণ করবে।
এই ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে যীশু উত্তর করে বলেছিলেন যে, ঈশ্বরের রাজ্য জাকজমকের সাথে
আসে না। কিন্তু ঈশ্বরের রাজ্য তাদের মধ্যেই যীশুর ব্যক্তিত্বে ও কার্য্যের দ্বারা এসে
গিয়েছিল, অর্থাৎ যীশু তাদের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, বাহ্যিক চিহ্ন সমূহের প্রতি বা
রাজনৈতিক রাজ্যের স্থাপনের প্রতি মনোনিবেশ না করে, তারা যেন বুঝতে চেষ্টা করে যে, যীশু
খ্রীষ্টের ব্যক্তিত্বের দ্বারা ঈশ্বরের রাজ্য তাদের মধ্যে উপস্থিত এবং যীশুকে বিশাসের
দ্বারা এই রাজ্যে প্রবেশ সম্ভব।
যীশুর বিভিন্ন
দৃষ্টান্তেও এই স্বর্গ-রাজ্যের বর্তমান উপস্থিতি সম্বন্ধেও শিক্ষা দেওয়া হয়েছে (মথি
১৩: ৪৪-৪৬, লুক ১৪:২৮-৩৩, মথি ৫:৫-১০)। শিষ্যরা যখন এই প্রশ্ন করেছিল- স্বর্গরাজ্যে
মহান কে? (মথি ১৮:৪), শিষ্যরা যখন শিশুদের আসতে বাধা দিয়েছিল (মথি ১৯:১৪), এছাড়াও
বিভিন্ন স্বর্গ-রাজ্যের উপস্থিতি সম্বন্ধে যে সকল চিহ্নের বর্ণনা করা হয়েছে, সে সকলই
বর্তমান দিকের প্রতি নির্দেশ করে।
আ) ভবিষ্যত দিক
যীশু তাঁর
শিক্ষায় এক অর্থে যখন ইতিপূর্বে ঈশ্বরের রাজ্যের আগমণ সম্বন্ধে বর্ণনা করেছেন। আবার
অন্য অর্থে একে ভবিষ্যতের বিষয় হিসাবে বর্ণনা করেছেন - উদাহরণ স্বরূপ - পর্বতে দত্ত
উপদেশের শেষাংশ (মথি ৭:২১-২৩, ৮:১১-১২)। বিভিন্ন দৃষ্টান্তেও ঈশ্বরের রাজ্যকে ভবিষ্যতের
ঘটনা হিসাবেও যীশু বর্ণনা করেছেন- মথি ২২:১-১৪ পদে বিবাহ ভোজের দৃষ্টান্ত, মথি ১৩:২৪-৩০,
৩৬-৪৩ পদে শ্যামা ঘাসের দৃষ্টান্ত, মথি ১৩:৪৭-৫০ পদে টানা জালের দৃষ্টান্ত, মথি ২৫:১-১৩
পদে ১০ কুমারীর দৃষ্টান্ত, মথি ২৫: ১৪-৩০ পদে তালন্তের দৃষ্টান্ত। অতএব ঈশ্বরের রাজ্য
সম্বন্ধে যীশুর শিক্ষায় বর্তমান এবং ভবিষ্যত উভয় বিষয়েরই উল্লেখ পাওয়া যায়।
খ) পৌলের শিক্ষায় ঈশ্বরের রাজ্যে বতর্মান ও ভবিষ্যত দিক
অ) বর্তমান দিক - (১করি ৪:১৯-২০, রোমীয় ১৪: ১৭-১৮ ভোজন পানের
বিষয় নয়, কলসীয় ১:১৩-১৪)।
আ) ভবিষ্যত দিক - (২করি, ২তীম ৪:১৮, ১করি ৬:৯, গালা ৫: ২১-২৬,
ইফি ৫:৫-২১, ১করি ১৫:৫০)।
শেষ কথা
একদিকে
যখন খ্রীষ্ট-বিশ্বাসী বর্তমানে ঈশ্বরের রাজ্যে আছে এবং একই দিকে যখন এই রাজ্যের আশীর্বাদ
সমূহ ভোগ করে চলেছে এবং অন্যদিকে এই রাজ্যে থাকায় দায়িত্বও পালন করে চলেছে, সঙ্গে
সঙ্গে সে বুঝতে পারে যে, বর্তমানের এই রাজ্য অস্থায়ী এবং অসম্পূর্ণ। তাই সে ভবিষ্যতের
দিকে তাকিয়ে থাকে যুগান্তে যে দিনে এর চুড়ান্ত পূর্ণতা সাধিত হবে। যেহেতু এই রাজ্যে
বর্তমান ও ভবিষ্যত উভয় দিকই আছে সেইহেতু অমরা বলতে পারি যে, অবিশ্বাসীদের কাছে এই
রাজ্য এখন লুকানো আছে, কিন্তু একদিন এ সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হবে- যে দিন এই রাজ্যের
শক্র পর্যন্ত এই রাজ্যের উপস্থিতি স্বীকার করবে (লূক ১৩:২০-২১)। সেই কারণে ঈশ্বরের
রাজ্য বর্তমান বাহ্যিক দৃশ্যের বিষয় নয়, কিন্তু বিশ্বাসের বিষয় (২ করি ৫:১৭)। কিন্তু
যখন এই রাজ্যের শেষ অধ্যায় উপস্থিত হবে বা যীশুর আগমণ হবে, তখন প্রত্যেক জানু পতিত
হবে ও প্রত্যেক জিহা স্বীকার করবে যে, যীশুই একমাত্র প্রভু ( ফিলিপীয় ২:১১)।


0 Comments