আদমের সঙ্গে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, তা কেবল তাঁর সঙ্গে নয়, কিন্তু তাঁর ভাবী বংশের সঙ্গেও, আদমের বংশধর হিসাবে জন্মগ্রহণকারী সমস্ত মানুষ আদমের প্রথম পাপে তাঁর সঙ্গে পাপ করল ও তাঁর সঙ্গে পাপে পতিত হল।
পতন মানবজাতিকে পাপ এবং দুঃখ-দুর্দশার অবস্থায়
নিয়ে গেল।
১। একজন মানুষের দ্বারাই জগতে পাপ প্রবেশ করেছিল
এবং পাপের দ্বারাই মৃত্যুর প্রবেশ ঘটেছিল ও মৃত্যু সকল মানুষের মধ্যে সংক্রামিত হয়েছিল,
কারণ সকলেই পাপ করেছিল (রোমীয় ৫:১২)।
২। একটি মাত্র মানুষের অবাধ্যতার ফলে অনেক মানুষকেই
পাপী বলে গণ্য করা হয়েছিল (রোমীয় ৫:১৯; ১২-২১ দেখুন) ।
৩। সকলেই পাপ করেছে এবং সকলেই ঈশ্বরদত্ত মহিমা
থেকে বিচ্যুত হয়েছে (রোমীয় ৩:২৩)। তাদের চলার পথে বিনাশ ও দুর্দশা (রোমীয় ৩:১৬)।
এই পাঠে, মানুষের পক্ষে
গ্রহণ করা কষ্টকর, এমন একটি মতবাদ আলোচনা করব। যে-ব্যক্তির ক্যান্সারের মতো কোন ভয়ঙ্কর
রোগ আছে, তিনি যেমন চিকিৎসক কিছু বলতে চাইলে শুনতে চান না, আমরাও তেমনই, পাপীরূপে,
বাইবেল আমাদের পাপ এবং দুর্দশা সম্পর্কে কী বলে, তা শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করি না। কিন্তু
তবু, বিস্ময়কর হল, এই বিষয়গুলি শুনতে ঘৃণা করলেও, এ থেকে অব্যহতি পেতে পারি না। সমস্ত
মানুষই পাপী — এ কথা কি সত্য নয়? এ কথা কি সত্য নয় যে, সকল মানুষই (এমনকী
ছোট শিশুরাও, যাদের দেখে অসহায় ও নির্দোষ বলে মনে হয়) মৃত্যুমুখে পতিত হবে? যদি সমস্ত
মানুষেরই মৃত্যু হয়, এবং পাপের শাস্তি হয় মৃত্যু, তা হলে, কী করে একজন মানুষও অস্বীকার
করতে পারে যে, “সকল মানুষ” আদমে পাপ করেছিল এবং
“তাঁর প্রথম অপরাধের
ফলে তাঁর সঙ্গে পতিত হল?” অন্যভাবে বলা যেতে
পারে, মানুষের পাপ এবং দুর্দশাই খ্রীস্টবিশ্বাসী (যিনি ঈশ্বরের বাক্য গ্রহণ করেন) এবং
অবিশ্বাসীর (যিনি ঈশ্বরের বাক্য প্রত্যাখ্যান করেন) মধ্যে পার্থক্য সূচিত করে না। না,
মানুষের পাপ এবং দুর্দশার ঘটনা সেখানে রয়েছে, সকলেই পাপী, এবং প্রত্যেকেরই মৃত্যু
হবে। পার্থক্য শুধু এই ঘটনাতেই যে, খ্রীস্টবিশ্বাসীরা এই পাপ এবং দুর্দশার কিছুটা কারণ
উপলব্ধি করে। এই বিষয়ের প্রতিই এখন আমরা মনোনিবেশ করি।
এককত্বের
দৃষ্টিকোণ
(১) প্রথম যে বিষয়টি
আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, তা হল, আদম এবং মানবজাতির অন্যান্য সদস্য সম্পর্কে একটি এককত্বের
দৃষ্টিকোণ আছে (যীশু খ্রীস্ট ছাড়া)। একটি একতা আছে। শাখা যেমন গাছেরই অংশ, আদম এবং
তাঁর বংশধররা (সন্তানরা) তেমনই অঙ্গ। বাইবেল বলে যে, ঈশ্বর “একটি মানুষ থেকে বিভিন্ন
মানবগোষ্ঠীর সৃষ্টি করলেন এই পৃথিবীর বুকে বসবাস করার জন্য” (প্রেরিত ১৭:২৬)।
অনেকটা একই রকমভাবে
বাইবেল আমাদের নিশ্চয়তা দেয় যে, আদমের কোন উত্তরপুরুষ (সাধারণ প্রজন্মের দ্বারা জাত)
কলুষিত প্রকৃতির ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। কারণ ইয়োব জিজ্ঞাসা করেন, “অশুচি থেকে শুচির উৎপত্তি
কে করতে পারে?” (ইয়োব ১০:৪) অথবা, “অবলার বা অশুচির সন্তান
কেমন করে বিশুদ্ধ হবে” (২৫:৪)? লক্ষণীয় যে, এই বিশ্বজনীন
নিয়মের একটি ব্যতিক্রম আছে। এই কারণে, ‘প্রশ্নোত্তর’ সাধারণ প্রজন্মের দ্বারা
আদম থেকে জাত এবং যারা আদমে পাপ করেছে এবং তাঁর সঙ্গে পতিত হচ্ছে, তাদের কথা বলেছে।
কারণ আমাদের প্রভু যীশু খ্রীস্ট সাধারণ প্রজন্মের দ্বারা জাত হননি। তিনি মরিয়ম ও যোসেফের
স্বাভাবিক সন্তানরূপে জন্মগ্রহণ করেননি। বিবাহের পূর্বে, মরিয়মের কুমারী অবস্থায়
(বাগদত্তা, কিন্তু কোন পুরুষের সঙ্গে বাস করছিলেন না) দূত তাঁর কাছে ঘোষণা করলেন যে,
তিনি এক পুত্র-সন্তানের জন্মদান করবেন। তিনি বললেন, “কেমন করে এ সম্ভব হবে?
আমি যে কুমারী!” (লুক ১:৩৪) উত্তরে দূত বললেন,
“পবিত্র আত্মা তোমার
উপর অধিষ্ঠিত হবেন। পবিত্র আত্মার শক্তিতে তুমি হবে পরিবৃতা। তোমার গর্ভে যে পবিত্র
সন্তান জন্মগ্রহণ করবেন, তিনি ঈশ্বরের পুত্র বলে অভিহিত হবেন" (লুক ১:৩৫)। এবং যোসেফ “সন্তান ভূমিষ্ঠ না হওয়া
পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে মিলিত হলেন না” (মথি ১:২৫)। তাই যীশু সাধারণ প্রজন্মের
দ্বারা জন্মগ্রহণ করেননি। সেই কারণে তিনি আদমে পাপ করেননি, এবং তাঁর সঙ্গে পতিত হননি।
তিনি অপরাধী হয়ে বা কলুষিত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেননি। কিন্তু অন্য সমস্ত মানুষ, এই
ব্যতিক্রম ছাড়া, আদমে পাপ করেছিল এবং তাঁর প্রথম অপরাধের জন্য পতিত হয়েছিল।
অসাদৃশ্য
বা ভিন্নতার দৃষ্টিকোণ
(২) দ্বিতীয় যে-বিষয়টি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে: সেই উপলব্ধি ছিল এমন যে, আদমের প্রথম পাপ আদমেরই, আমাদের নয়। এই প্রশ্নটি যদি আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, তা হলে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। আমরা কি এদন উদ্যানে, জীবিত ব্যক্তিরূপে, সত্যিসত্যিই উপস্থিত ছিলাম? নিষিদ্ধ ফল গ্রহণ করার জন্য আমরা কি সত্যিসত্যিই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম? অবশ্যই এর উত্তর, আমরা তা করিনি। কারণ ব্যক্তি হিসাবে আমাদের কোন অস্তিত্ব ছিল না। একটি গাছ যখন প্রথমে রোপন করা হয়েছিল, গাছে তখন কোন ফল ছিল না। তাই, আদমকে যখন উদ্যানে রাখা হয়েছিল, তখন আমাদের কোন অস্তিত্ব ছিল না। একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন আমাদের সামনে প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে আসে: যে কাজ আসলে আমি নিজে করিনি, তার জন্য ঈশ্বর কীভাবে আমাকে দোষারোপ করতে পারেন? গাছ এবং ফলের দৃষ্টান্তটি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। কারণ গাছে, এবং ফলে, এই রকম কোন স্বাধীন পছন্দ নেই। কিন্তু আদমে তা ছিল। তিনি (তাঁর নিজস্ব ইচ্ছার স্বাধীনতায় চালিত হয়ে) ভুল জিনিস পছন্দ করেছিলেন বলে আমরা এখন অপরাধী। এ বিষয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন আছে।
প্রতিনিধিত্বমূলক
নীতি
রোমীয় ৫:১৯ পদে পৌল
বলেন, “একটি মাত্র মানুষের
অবাধ্যতার ফলে অনেক মানুষকেই পাপী বলে গণ্য করা হয়েছিল”। আদম মানবজাতির পিতা,
তাই আমরা অবশ্যই বলব যে, প্রধান প্রতিনিধি তিনি মানবজাতির জন্য কাজ করেছিলেন। আমরা
অবশ্যই স্বীকার করব যে, বহু লোকের কাছে এটি অন্যায্য, অন্যায় বলে মনে হয়। তাঁদের
কাছে অন্যায় মনে হবার কারণ, শুরুতেই তাঁরা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, এবং তাঁদের পছন্দের
কোন অবকাশ নেই। তাঁরা যেন বলতে চান, “আদমের যে সুযোগ ছিল,
আমারও যদি তা থাকত, আমি তা হলে পাপ করতাম না। কিন্তু আমি পছন্দ করি, বা না-করি, ঈশ্বর
আমাকে পাপী সাব্যস্ত করছেন।” (আসল বিষয় হল, আদম
পাপ করার আগেই ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থির করে রেখেছিলেন। আরও একটি কথা,
আমাদের অস্তিত্বের প্রথম থেকেই আমরা আদমের মতোই ঈশ্বরদ্রোহী। এ নয় যে, ঈশ্বর নির্দোষ
ব্যক্তিদের নিয়ে, তাদের পছন্দ-অপছন্দের তোয়াক্কা না-করেই তাদের আদমের পাপের অধীন করেন।
বরং, অস্তিত্বের সঙ্গে সঙ্গেই তারা আদমের পাপের অধীনস্থ হয়েছে। এবং তারা (তাদের প্রকৃতির
দ্বারা, যা পাপপূর্ণ) দেখায় যে, তারা আদমের মতো পাপী হতে চায়। বাইবেল বলে, “মাতৃগর্ভ থেকেই দুষ্টেরা
বিপথগামী, জন্মাবধি মিথ্যাভাষণের ফলে তারা বিভ্রান্ত” (গীতসংহিতা ৫৮:৩)। অন্যভাবে বলা যায়,
তারা দেখায় যে, তারা আদমের পাপকে সমর্থন করেছে এবং এইভাবে তারা পূর্ণমাত্রায় এর অংশীদার।
আদমের পাপে সকল মানুষের
(যীশু ব্যতীত) অংশগ্রহণকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে অন্যতম একটি বিষয় (আমাদের মতে) অসুবিধার
সৃষ্টি করে। সেটি হল: সৃষ্টিবাদ (Creationism - প্রত্যেক ব্যক্তির
জন্মের সময় ঈশ্বর তাঁর আত্মা সৃষ্টি করেন)। সৃষ্টিবাদের মতবাদ শিক্ষা দেয় যে, আদম
থেকে সাধারণ প্রজন্মের দ্বারা দেহ সৃষ্টি হয়েছে, অথচ আত্মা ঈশ্বরের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে
সৃষ্ট। এই শিক্ষার দ্বারা আমাদের প্রকৃতির শারীরিক অংশ পাই আমাদের পিতামাতার কাছ থেকে,
কিন্তু অ-শারীরিক অংশ (প্রাণ অথবা আত্মা) আসে ঐশ্বরিক সৃষ্টির কর্মের দ্বারা। এই দৃষ্টিভঙ্গি
অনুসারে, আমাদের দেহ আদমের পাপে দূষিত বা কলুষিত। আমাদের আত্মাকে দূষিত দেহে স্থাপন
করায় এবং ঈশ্বর অপরাধ আরোপ করায় আমাদের আত্মা পাপময় ও কলুষিত হয়েছে। একে বাইবেলসম্মত
শিক্ষা বলে মনে হয় না। বরং, মনে হয়, এই শিক্ষা এসেছে ভ্রান্ত গ্রিক চিন্তাধারা থেকে।
গ্রিকদের ধারণা যে, বস্তুগত বিষয় (যেমন শরীর) মন্দ এবং আত্মিক বিষয় সমূহ (যেমন আত্মা)
উত্তম। এই কারণেই আমরা বিশ্বাস করি যে, traducianism - ই হবে সঠিক শিক্ষা।
এই মতবাদটি হল, সাধারণ প্রজন্মের দ্বারা, পিতামাতার কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ মানব (দেহ এবং
আত্মা উভয়ই) পাওয়া যায়। বাইবেল যখন বলে, “আদম …… আপনার সাদৃশ্যে ও প্রতিমূর্তিতে
পুত্রের জন্ম দিয়া তাহার নাম ... রাখিলেন,” তখন শুধু তা দেহের
কথাই বলে না (আদি ৫:৩), কিন্তু পূর্ণাঙ্গ মানুষের কথা বলে। নিম্নলিখিত কারণে এই দৃষ্টিভঙ্গি
আমরা সঠিক বলে মনে করি:
(ক) আদম পূর্ণাঙ্গ মানবরূপে পাপ করেছিলেন। শুধু
আত্মা এককভাবে পাপ করেনি। দেহও শুধু এককভাবে পাপ করেনি। আদম – যাঁর দেহ ও আত্মা উভয়ই
ছিল, তিনিই পাপ করেছিলেন।
(খ) বাইবেল এমন কথা বলে না ঈশ্বর স্বতন্ত্রভাবে আত্মা
সৃষ্টি করছেন (যেমন তিনি স্বর্গদূতদের সৃষ্টি করেছিলেন) বা স্বতন্ত্রভাবে দেহ নির্মাণ
করছেন, প্রকৃতপক্ষে, শাস্ত্র শুধু তাঁর আদম ও হবাকে সৃষ্টি করার বিষয়ে বলেছে,
যা তিনি করেছিলেন তাদের দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে।
(গ) আদম যদি কেবল দেহেরই জন্ম দিতেন, তা হলে বলা সম্ভব
হত না যে, তিনি “তাঁর প্রতিমূর্তিতে জন্ম দিয়েছেন (আদি ৫:৩)। কারণ প্রতিমূর্তি শুধু
দেহে বা শুধু আত্মায় বিরাজ করে না, বিরাজ করে পূর্ণাঙ্গ মানবে। এবং
(ঘ) সবশেষে, শাস্ত্রে এমন কথা বলা হয়নি দেহের সংস্পর্শে
(বা সম্মিলনে) আসার ফলে আত্মা কলুষিত হয়েছে, এ শুধু আদমের আদিম পাপে অংশগ্রহণরূপে
বর্ণিত হয়েছে। দেহের সঙ্গে আত্মার সংস্পর্শ নয়, এই পতন মানুষকে পাপ এবং দুর্দশার
অবস্থায় নিয়ে এসেছিল। এইসব কারণে Traducianism - কে (মানুষের আত্মা পিতা-মাতার
দ্বারা সন্তানদের প্রতি প্রবাহিত হয়) আমরা সৃষ্টিবাদের চেয়ে বেশি পছন্দসই বলে বিশ্বাস
করি।
মহান
সমান্তরাল






0 Comments