কি প্রকার পাপময়তার পরিস্থিতিতে মানুষ পতিত হয়েছিল ?
পাপে পতনের ফলস্বরূপ মানুষ যে পাপময়তার পরিস্থিতিতে পতিত হয়, তা হল আদমের প্রথম পাপের অপরাধ, প্রাথমিক ধার্মিকতার অভাব, এবং তার পূর্ণাঙ্গ প্রকৃতির কলুষতা, (যাকে সাধারণত প্রাথমিক পাপ বলা হয়,) এবং এর থেকে উদ্ভূত সমস্ত প্রকৃত অপরাধ।
১. একটি মাত্র মানুষের অবাধ্যতার ফলে অনেক মানুষকেই পাপী বলে গণ্য করা হয়েছিল (রােমীয় ৫:১৯)।
২. কেউই ধার্মিক নয়, একজনও না (রােমীয় ৩:১০)।
৩.প্রভু পরমেশ্বর দেখলেন, পৃথিবীতে মানুষের দুস্কর্ম অত্যধিক বেড়ে গিয়েছে। তাদের অন্তর সারাক্ষণ কেবল মন্দ চিন্তা ও কল্পনায় ব্যাপৃত (আদি ৬ : ৫)।
৪. মনের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে যত কুচিন্তা, নরহত্যা, ব্যভিচার, লালসা, চুরি, মিথ্যাসাক্ষ্য ও পরনিন্দা।
আদম থেকে তাঁর উত্তরপুরুষের মধ্যে কীভাবে প্রথম পাপ সঞ্চালিত হয়েছে, আমাদের পূর্ববর্তী পাঠে আমরা সে - বিষয়ে আলােচনা করেছি। এই পাঠে, আমরা এই আদিম পাপের প্রকৃতি সম্পর্কে বিশদ আলােচনা করব, কারণ পাপী মানুষের মধ্যে তার অস্তিত্ব থেকে গেছে। “আদমের প্রথম পাপের অপরাধ" নিয়ে আমরা আর আলােচনা করব না, কারণ আমাদের পূর্ববর্তী পাঠে এই বিষয়টি নিয়ে আমর ইতােপূর্বেই আলােচনা করেছি। “আদিম বা মূল ধার্মিকতার অভাব” – যার অর্থ, আদমে এক সময় যে পাপহীনতা ছিল, তার বিনাশ – এ নিয়েও আমরা আলােচনা করব না । আমরা বরং মানুষের পূর্ণাঙ্গ প্রকৃতির দূষিত অবস্থা নিয়ে আলােচনা করব ।
সম্পূর্ণ পতন
আমরা প্রায়ই মানুষের সম্পূর্ণ প্রকৃতির কলুষতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই রকম শব্দ প্রয়ােগ করে থাকি আমরা বলি যে, মানুষ সম্পূর্ণভাবে পতিত হয়েছে। এবং এর অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে, আদিপুস্তক ৬ : ৫ পদের অভিব্যক্তিটি লক্ষ করা যাক।
(১) প্রথম, আমরা লক্ষ করি, মানুষের কলুষতা (অথবা দুষ্টতা) অভ্যন্তরীণ। এ মানুষের প্রকৃতির গভীরে অবস্থিত। মানুষ তা দেখতে না পেলেও, ঈশ্বর পান।
(২) দ্বিতীয়ত, আমরা লক্ষ করি, এই দুষ্টতা গুরুতর। ঈশ্বরের দৃষ্টিতে এই দুষ্টতা বড়াে ধরনের। মানুষ বলতে পারে, তারা দুষ্ট নয়, কিন্তু ঈশ্বর বলেন, তাদের দুষ্টতা গুরুতর, বড়াে ধরনের।
(৩) তৃতীয়ত, আমরা লক্ষ করি যে, এই দুষ্টতা অবিরাম। মানুষের হৃদয়ের দুষ্টতা কিছু সময়ের নয়, বরং সর্বসময়ের।
(৪) এবং সবশেষে, আমরা দেখি, এই দুষ্টতা বিশ্বজনীন। এমন কেউ নেই, যে তার প্রকৃতিতে মন্দ নয়। মানুষের সম্পূর্ণ পতন সম্পর্কে বলার সময় আমরা এই রকম ঘটনাগুলির প্রতিই ইঙ্গিত করে থাকি। এর দ্বারা আমরা বুঝিয়ে থাকি যে, পাপ (কতকগুলি ভয়ঙ্কর রােগ জীবাণুর মতাে) মানবপ্রকৃতির সমগ্ৰ অংশকে এবং মানুষের সমস্ত কাজকে সংক্রমিত করেছে।
কিন্তু এখন একটি বিষয় উপলব্ধি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ: মানুষের সম্পূর্ণ পতনের সম্পূর্ণ অর্থ কী! কারণ দুটি ভিন্ন পদ্ধতিতে আমরা কোনাে বিষয়কে সম্পূর্ণভাবে পতিতরূপে চিন্তা করতে পারি। একটি বিষয় ব্যাপ্তিতে বা স্বভাবের বিস্তারে সম্পূর্ণভাবে কলুষিত হতে পারে (অর্থাৎ, দূষিত-অবস্থা, পচনত্ব, বা কলুষতা প্রত্যেকটি অংশে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে)। অথবা একটি বিষয় মাত্রাতে বা অত্যধিক মাত্রায় সম্পূর্ণভাবে কলুষিত হতে পারে (অর্থাৎ, কলুষতা হতে পারে চরম; যত দূর মন্দ হতে পারে)। ১৩.১ চিত্ররূপে এই দুইয়ের মধ্যে আমরা পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি ।
প্রথমে আমরা এক গ্লাস বিশুদ্ধ জল নিই। একে আদমের প্রাথমিক বিশুদ্ধতার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এখন , পরের মাঝের চিত্রটিতে আমরা এক বিন্দু ভয়ঙ্কর বিষ মেশালাম। বিষটি জলের সঙ্গে মিশে সমস্ত গ্লাসে ছড়িয়ে পড়ল। গ্লাসের সমস্ত জলটাই এখন নষ্ট হয়ে গেছে। নষ্ট, তার কারণ, বিষ জলের সকল অংশকে দূষিত করেছে। সময় যত অতিক্রান্ত হবে, ভয়ঙ্কর জীবাণুর সংখ্যা তত বৃদ্ধি পাবে। মানুষের পতিত প্রকৃতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযােজ্য। এখন, আর একটি গ্লাসের কথা চিন্তা করুন। যার মধ্যে বিষ বা রােগজীবাণু ছাড়া আর কিছুই নেই। এ শয়তানের দুষ্টতার অনুরূপ। কারণ তার মধ্যে লেশমাত্র ভালাে নেই। দুষ্টতা পূর্ণতম মাত্রায় পৌচেছে। দুষ্ট লােকেরা যখন নরকে নিক্ষিপ্ত হয়, তারাও শয়তানের মতােই হবে। কিন্তু তারা যতদিন এই জগতে আছে, আমরা দেখি যে, শয়তানের মধ্যে যতটা দুষ্টতা আছে, তাদের মধ্যে তখনও ততটা পূর্ণতা লাভ করেনি। আমরা তখন বলি যে, তারা ব্যপ্তিতে সম্পূর্ণরূপে কলুষিত (তাদের সম্পূর্ণ প্রকৃতি পাপের দ্বারা কলুষিত), কিন্তু মাত্রায় নয় ।
মানুষ কেন অধিকতর মন্দ নয় ?
মানুষের পক্ষে যতটা মন্দ প্রকৃতির হওয়া সম্ভব, সে কেন এখনও ততটা মন্দ হয়নি (যেমন শয়তান, এবং নরকের পাপীরা)? তার কারণ ঈশ্বরের অনুগ্রহ। মানুষের পক্ষে যতটা মন্দ হওয়া সম্ভব, সমস্ত মানুষ যদি ততটাই মন্দ হতে থাকে, তা হলে কল্পনা করে দেখুন, জগৎ কি ভয়ঙ্কর স্থনে পরিণত হত! সমস্ত মানুষ তখন খুন, চুরি করত; সব সময় সব রকমের দুষ্টতা করত। সমগ্র জগৎ হিংস্রতায় ভরে যেত। জীবনের অগ্রগমন সম্পর্কেই তখন সংশয় দেখা দিত। লক্ষ করুন: ঈশ্বর যদি পাপকর্মকে শ্লথগতি না করতেন, এই রকমই হত। ঈশ্বর কীভাবে তা করেন? তিনি বিভিন্ন ভাবে তা করেন।
(১) ঈশ্বর পাপী মানুষের মধ্যে বিবেকের কর্ম রেখে দিয়েছেন। এই বিবেক দুষ্ট লােককে ভালােয় পরিণত করে না। কিন্তু পাপকর্মকে এ কিছুটা মাত্রায় দমন করতে সাহায্য করে (রােমীয় ২:১৫)।
(২) আর একটি বিষয়, পাপীদের মন্দ কর্ম থেকে বিরত করার জন্য ঈশ্বর জগতে অসামরিক সরকার স্থাপন করেছেন। ঈশ্বর দুষ্ট লােকদের ভীতির কারণ হিসাবে জগতে প্রশাসকদের নিযুক্ত করেছেন (রােমীয় ১৩ : ১-৫)।
(৩) আর একটি বিষয়, মৃত্যুর ভয় মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে (ইব্রীয় ২:১৫)।
(৪) পরিবার, শিক্ষা এবং সমাজের প্রভাব মানুষের হৃদয়ে ও জীবনে পাপের কাজকে হ্রাস করতে সাহায্য করে। এই সমস্ত বিষয়ের কারণেই আমরা দুষ্ট লােকদের জীবনের, কিছু ভালােকে চিনতে পারি। অন্য ভাষায় বলা যায়, মানবিক দৃষ্টিতে, দুষ্ট লােক প্রায়ই শােভনভাবে কাজ করে। কিন্তু আমরা কখনই বিস্মৃত হব না যে, তাদের মধ্যে সত্যিসত্যিই ভালাে আছে, এর পশ্চাত এমন কোন কারণ নেই।
পাপী মানুষ কী করতে পারে না
মানুষের নিজের জন্য ভালাে কিছু করার সম্পূর্ণ অক্ষমতার এই মতবাদকে কিছু মানুষ পছন্দ করেন না। তাঁরা বলেন, এই শিক্ষা যদি সত্য হয়, তা হলে মানুষের কোন প্রকৃত স্বাধীনতা নেই। তাঁরা একটি বিষয়ে ভুল করে বসেন, তারা স্বাধীনতা এবং সক্ষমতার মধ্যে যথার্থ প্রভেদ নির্ণয় করতে পারেন না। সাধারণভাবে এগুলি একই রকমের মনে করা হলেও আসলে তা নয়। স্বাধীনতা শুধু বাহ্যিক চাপের (বা শক্তির) অনুপস্থিতি। কোন লােককে যদি তার ইচ্ছা মতাে কাজ করতে দেওয়া হয়, তা হলে আমরা নিশ্চয়ই বলতে পারি যে, সে স্বাধীন । কিন্তু একজন ব্যক্তি সব সময় তার ইচ্ছা মতাে কাজ করতে সক্ষম নয়। মানুষকে সর্বদা ওড়বার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন কৌশল আবিস্কৃত হয়েছে, তার ওড়ার সক্ষমতা ছিল না। ঈশ্বরের, তাঁর ইচ্ছা মতাে যে-কোন কাজ করার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু তাঁর মিথ্যা কথা বলার সক্ষমতা নেই। ঈশ্বর মিথ্যা বলতে পারেন না, কারণ তাঁর নিজস্ব আন্তর প্রকৃতির দ্বারা তিনি নিয়ন্ত্রিত। তিনি পবিত্র, সেই কারণে তিনি মিথ্যা বলতে পারেন না। কিন্তু এই কারণেও মানুষ ভালাে কিছু করতে পারে না (পবিত্র আত্মার দ্বারা নবজন্ম লাভ না করা পর্যন্ত)। সৎ কর্ম করার স্বাধীনতা তার আছে, মন্দ কাজ করার জন্য কেউ তার উপর চাপসৃষ্টি করছে না, কিন্তু সে সৎকর্ম করতে সক্ষম নয়। তার নিজস্ব আন্তরপ্রকৃতি মন্দ হওয়ার জন্য মন্দের প্রতি তার প্রবণতা থাকে। “কেউ কি কখনও তার গায়ের রং বদলাতে পারে অথবা চিতাবাঘ কি তার গায়ের ছাপ পাল্টে দিতে পারে? তা যদি পারে, তবে তুমি যে মন্দ ছাড়া আর কিছুই কোনদিন করনি, সেই তুমিও ন্যায় কাজ করতে পারবে" (যিরমিয় ১৩:২৩)।
তা হলে, আমরা সংক্ষিপ্তসার করে বলতে পারি যে, মানুষ যতদিন তার নিজস্ব প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে চলবে, সে ক্রমাগত বেশি মন্দ কাজ করবে। সে যে ওইভাবে করতে বাধ্য হয়, তা নয়। কিন্তু, সে স্বেচ্ছায় তা পছন্দ করে। চিন্তা করুন সমগ্র মানবজাতি (নােহ এবং তাঁর পরিবার ব্যতীত, ঈশ্বরের অনুগ্রহে যারা উদ্ধারলাভ করেছিলেন) কীভাবে মহাপ্লাবনের পূর্বে পৃথিবীকে হিংস্রতায় ভরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু, ঈশ্বরের এই বিচারও মন্দ কাজের প্রতি প্রবণতাকে নিরাময় করতে পারেনি, কারণ আমরা দেখতে পাই, মহাপ্লাবনের পর দুষ্ট লােকেরা বাবেলের মিনার নির্মাণ করার চেষ্টা করেছিল। এবং তখন ঈশ্বর অব্রাহামকে আহ্বান করলেন, ইস্রায়েল জাতির সৃষ্টি করলেন। এই অব্রাহামের কাছে ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু প্রায়ই তারা ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। হিতােপদেশ ১:২৪ পদে আমরা পড়েছি, “আমি ডাকলাম, কিন্তু কেউ সাড়া দিল না, আমি হাত বাড়ালাম, কিন্তু কেউ ফিরে তাকাল না।" এ কি মানুষের প্রকৃত চিত্র নয়? সমগ্র বাইবেল কি আমাদের একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে আসে না যে: প্রত্যেকটি অংশে মানুষ কলুষিত, এবং কোনরকম সৎকর্ম করতে সম্পূর্ণভাবে অক্ষম?







0 Comments